নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন ২০২৬ ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সামনে আসছে। প্রার্থী মনোনয়ন, মনোনয়ন প্রত্যাহার, কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণা এবং কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতার—পরপর এই ঘটনাগুলিতে নন্দীগ্রামের নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর ২০২৬ নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে এবং ৯ অক্টোবর ভোট গণনা হওয়ার কথা। নন্দীগ্রাম কেন্দ্রটি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর পদত্যাগের কারণে শূন্য হয়।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন কবে?
নির্বাচন কমিশনের সূচি অনুযায়ী—
ভোটগ্রহণ: ৬ অক্টোবর ২০২৬
ভোট গণনা: ৯ অক্টোবর ২০২৬
মনোনয়ন জমার শেষ দিন: ১৬ সেপ্টেম্বর
মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন: ১৯ সেপ্টেম্বর
নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের পাশাপাশি রেজিনগরেও একই দিনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নন্দীগ্রামে প্রথমে কারা প্রার্থী ছিলেন?
উপনির্বাচনের শুরুতে নন্দীগ্রামে একাধিক রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী প্রার্থী ঘোষণা করে। বিজেপির প্রার্থী হিসেবে হাসিরানি রথের নাম ঘোষণা করা হয়। কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন মিলন প্রধান। বামেদের হয়ে সিপিআই শান্তিগোপাল গিরিকে প্রার্থী করে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের দুই পৃথক গোষ্ঠীও নন্দীগ্রামে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী মহম্মদ এতেশামুল হককে প্রার্থী করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী সঞ্চিতা প্রধান দেকে প্রার্থী করেছিল।
সঞ্চিতা প্রধানের মনোনয়ন প্রত্যাহার
১৯ সেপ্টেম্বরের আগে নন্দীগ্রামের নির্বাচনী সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন।
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে নন্দীগ্রামের নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ হয়।
সঞ্চিতা কেন মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ও জল্পনা সামনে এসেছে। তবে এসব দাবিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য হিসেবেই দেখা উচিত।
মমতার সমর্থনের পরই মিলন প্রধান গ্রেফতার
সঞ্চিতা প্রধানের মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের কথা জানান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরনো একটি মামলায় মিলন প্রধানকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মামলাটি ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনের সময়ের একটি পুরনো মামলা।
এই গ্রেফতারকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গ্রেফতারের বিষয়টি পুরনো মামলার আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই বিষয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং আদালত-সংক্রান্ত তথ্যকে আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়েও টানাপোড়েন
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক নিয়েও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তীভাবে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ও দলের নাম ব্যবহারের বিষয়টি স্থগিত করে দুই গোষ্ঠীর জন্য আলাদা নাম ও প্রতীক নির্ধারণ করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরকে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক দেওয়া হয়েছে এবং অপর গোষ্ঠীকে ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নামে ‘খাম’ প্রতীক দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন বলেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে এখন নজর কোন দিকে?
৬ অক্টোবরের ভোট যত এগিয়ে আসছে, কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে নজরে রয়েছে—
কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের আইনি পরিস্থিতি কী হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থন কংগ্রেস প্রার্থীর প্রচারে কীভাবে প্রতিফলিত হয়।
তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক লড়াই কীভাবে ভোটের ময়দানে প্রভাব ফেলে।
বিজেপি ও বামেদের প্রচারের কৌশল কী হয়।
নন্দীগ্রামের স্থানীয় ইস্যুগুলি ভোটারদের কাছে কতটা গুরুত্ব পায়।
নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে আগাম কোনও সিদ্ধান্তে না গিয়ে ভোটের আগে প্রার্থী, প্রচার, স্থানীয় ইস্যু এবং ভোটারদের অংশগ্রহণের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নন্দীগ্রাম পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত পরিচিত বিধানসভা কেন্দ্র। ২০০৭ সালের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনের কারণে কেন্দ্রটির রাজনৈতিক গুরুত্ব বহু বছর ধরে রয়েছে।
২০২৬ সালের উপনির্বাচনে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন কয়েকটি বিষয়—তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নির্বাচন কমিশনের নাম-প্রতীক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, প্রার্থী প্রত্যাহার এবং কংগ্রেসকে সমর্থনের মতো ঘটনাপ্রবাহ।
ফলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন ২০২৬ শুধু একটি বিধানসভা আসনের ভোট নয়, বরং রাজ্যের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
শেষ কথা
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন, দলীয় সমীকরণ, কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণা এবং মিলন প্রধানের গ্রেফতার—সব মিলিয়ে ভোটের আগে নন্দীগ্রামে রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে। ৬ অক্টোবর ২০২৬ ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর গণনার পরই নন্দীগ্রামের নির্বাচনী ফলাফলের চূড়ান্ত ছবি স্পষ্ট হবে।
আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।